অন্ধকারের ছায়া

 

অন্ধকারের ছায়া

মোঃ বিপ্লব আহমেদ

প্রথম অধ্যায়: রহস্যময় ডাক



রাত তখন গভীর। ঢাকার ব্যস্ত শহর নিস্তব্ধ। টেবিলে রাখা মোবাইলের স্ক্রিন ভেসে উঠল, এক অচেনা নম্বর থেকে ফোন। নীরবতার মাঝে রিংটোনের শব্দ যেন পুরো ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো।

"হ্যালো?" রাতুল ফোনটা কানে তুলল, গলা কিছুটা ভারী। কাজের চাপ আর ক্লান্তি মিলে সে গভীর ঘুমে ছিল।

অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এল এক অদ্ভুত স্বর—নিম্ন, ধীর এবং হিমশীতল।
"তুমি কি নিজের জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত? সবকিছু ঠিকঠাক চলছে?"

রাতুল বিরক্তি নিয়ে বলল, "কে বলছেন? এভাবে বিরক্ত করার মানে কী?"

সেই অদ্ভুত স্বর আবার বলল, "তোমার চারপাশে অন্ধকার। তুমি কি জানো, কারা তোমাকে দেখছে?"

ফোন কেটে গেল। রাতুল কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। এক মুহূর্তে মনে হলো কোনো দুষ্টু লোক হয়তো মজা করছে। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর, তার মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তার মনের গভীরে একটা অস্বস্তি সৃষ্টি করল।

দ্বিতীয় অধ্যায়: অদ্ভুত ঘটনা

পরদিন সকালে রাতুল তার অফিসের দিকে রওনা হলো। অফিসে যাওয়ার পথে তার চোখে পড়ল, এক অদ্ভুত দৃশ্য। ফুটপাতের এক বৃদ্ধ ভিক্ষুকের হাতে তার নাম লেখা একটা কাগজ।

"রাতুল," বৃদ্ধটি ফিসফিসিয়ে বলল। "তোমার পেছনে যা আছে, তা থেকে পালাতে পারবে না।"

রাতুল থমকে দাঁড়াল। বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, "তুমি কী বলছ? কে তুমি?"

কিন্তু বৃদ্ধ আর কোনো কথা বলল না। তার চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক। সে পেছন ফিরে দ্রুত চলে গেল।

তৃতীয় অধ্যায়: রহস্যময় খাম

সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে রাতুল দরজার নিচে একটা খাম পেল। খামটি সাদা, তবে এতে কোনো প্রেরকের নাম নেই। খুলে ভেতরে দেখা গেল একটি ছবি—কাঠের পুরোনো বাড়ি, ভাঙা জানালা, আর বাড়ির সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শুকনো পাতা।

ছবির পেছনে শুধু একটি লাইন লেখা:
"তোমার অতীত তোমাকে ডাকে।"

রাতুল কাঁপা হাতে খামটি বন্ধ করল। তার মনের মধ্যে প্রশ্নের ঝড়। এই বাড়িটি কি তার চেনা? কোথায় দেখেছে?

চতুর্থ অধ্যায়: যাত্রা অজানার দিকে

পরদিন রাতুল ঠিক করল, এই বাড়ির রহস্য উদঘাটন করতেই হবে। অনলাইনে খোঁজ করে জানা গেল, ছবির বাড়িটি ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে, সুনসান এক গ্রামের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনা।

বন্ধু রাজীবকে সঙ্গে নিয়ে সে যাত্রা করল। রাজীব প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, কিন্তু রাতুলের মুখের চেহারা দেখে সে রাজি হয়ে গেল।

গ্রামে পৌঁছে বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে রাতুলের মনে হলো, সে যেন এই জায়গাটি আগে দেখেছে। বাড়িটি ভগ্নপ্রায়; জানালার কাচ ভাঙা, দেওয়ালে ফাটল। চারপাশে শুধু সুনসান নীরবতা।

"এই বাড়ি দেখতে তো ভূতুড়ে সিনেমার মতো লাগে," রাজীব বলল।

"চলো ভেতরে যাই," রাতুল দৃঢ় গলায় বলল।

পঞ্চম অধ্যায়: লুকানো কক্ষ

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে তারা দেখতে পেল, পুরো বাড়ি ধুলোয় ভরা। দেয়ালে পুরোনো ছবি, কাঠের মেঝে কড়মড় শব্দ করছে। হঠাৎ একটি ছবির ফ্রেমে রাতুলের চোখ আটকে গেল।

ছবিতে ছিল একটি পরিবার—তিনজন মানুষ। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে রাতুলের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বইল।

"এটা তো আমার বাবা!" সে চিৎকার করে উঠল।

রাজীব অবাক হয়ে বলল, "তোমার বাবা? তিনি তো কখনো এই বাড়ির কথা বলেননি।"

"কিন্তু এখানে তিনি আছেন, আর এই বাড়ি সম্পর্কে কিছু জানতাম না কেন?"

তারা ঘরে খুঁজতে শুরু করল। হঠাৎ রাজীব একটি লুকানো দরজার সন্ধান পেল। দরজাটি কাঠের আলমারির পেছনে লুকানো ছিল। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ বেরিয়ে এলো।

ষষ্ঠ অধ্যায়: অতীতের ছায়া

দরজার ভেতরে ঢুকে তারা দেখতে পেল একটি অন্ধকার ঘর। ঘরের এক কোণে ছিল পুরোনো কাগজপত্র আর কিছু ডায়েরি। রাতুল একটি ডায়েরি খুলল।

ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা:
"আমরা যে ভুল করেছি, তার শাস্তি আমাদের সন্তানদেরও ভুগতে হবে।"

ডায়েরি পড়তে পড়তে রাতুল জানল, তার বাবা এবং আরও কয়েকজন মিলে এখানে একটি গোপন গবেষণা করতেন। সেই গবেষণার ফলস্বরূপ একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটে, যা তাদের সবাইকে এখান থেকে পালাতে বাধ্য করেছিল।

সপ্তম অধ্যায়: মুখোমুখি সত্যের

ডায়েরির শেষ পাতায় একটি নোট ছিল:
"যদি তুমি এখানে আসো, তবে সাবধান। কিছু এখনও ঘুমিয়ে আছে।"

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে শব্দ ভেসে এলো। কেউ যেন ভারী পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

"কে?" রাজীব ফিসফিসিয়ে বলল।

কিন্তু কোনো উত্তর এল না। ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন এক ছায়া তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

রাতুল এবং রাজীব দৌড়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু তারা বুঝতে পারল, বাড়িটি তাদের পিছনে ফেলতে পারছে না।


উপসংহার: পালানো অসম্ভব

বাড়ি থেকে ফিরে আসার পরও রাতুলের জীবনে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। সে প্রতিদিন নতুন রহস্যের মুখোমুখি হয়। একদিন রাতে আবার সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ফোনে:
"তুমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছ, কিন্তু বাড়ি তোমার ভেতরে রয়ে গেছে।"

রাতুল বুঝতে পারল, সে তার অতীতের একটি অংশে বন্দি। এর থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না।

বাকি অংশ

অষ্টম অধ্যায়: বাঁচার লড়াই

রাতুল ফোনটি রেখে চুপচাপ বসে রইল। তার মনের ভেতর তোলপাড় চলছিল। বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকে সবকিছুই অদ্ভুত হয়ে উঠেছে। অফিসের কাজ করার সময়ও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল সেই বাড়ির স্মৃতি।

রাজীব পরদিন তাকে ফোন করে জানাল, সেও রাতে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নে সে দেখেছে, বাড়ির ভেতরের সেই অন্ধকার ঘর এবং দরজার ওপাশ থেকে কেউ তাকে ডাকছে।

“রাতুল, আমরা যা করেছি, তাতে কিছু একটা ঠিক নয়। মনে হয় বাড়িটা আমাদের ছাড়বে না। আমাদের কিছু একটা করতে হবে,” রাজীব বলল।

রাতুল গভীরভাবে বলল, “হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু কীভাবে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়?”

রাজীব তাকে একটি প্রস্তাব দিল:
“আমার পরিচিত একজন আছে, যিনি এই ধরনের অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে কাজ করেন। আমরা তার কাছে যেতে পারি।”


নবম অধ্যায়: রহস্যভেদকারী

পরের দিন তারা দেখা করল মৃণাল সেন নামের একজন প্যারাসাইকোলজিস্টের সঙ্গে। মৃণাল ছিলেন একজন গবেষক, যিনি অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে কাজ করতেন।

রাতুল পুরো ঘটনাটি তাকে বলল। বাড়ির অদ্ভুত ছবি, লুকানো কক্ষ, সেই ডায়েরি, এবং অদ্ভুত কণ্ঠস্বর—সবকিছু।

মৃণাল তার নোটবুকে কিছু লিখলেন এবং বললেন, “তোমরা যে বাড়ির কথা বলছ, সেটা একটা শক্তিশালী অতিপ্রাকৃত কেন্দ্র। এটি কেবল একটি জায়গা নয়, এটি এক ধরনের শক্তি, যা সময়ের সঙ্গে সেখানকার ঘটনার দ্বারা জন্ম নিয়েছে। তোমার বাবা এবং তার দল সেখানে যা করেছিল, তা হয়তো এই শক্তিকে জাগিয়েছে।”

“তাহলে এখন কী করতে হবে?” রাজীব জিজ্ঞাসা করল।

“আমাদের বাড়িটিতে ফিরে যেতে হবে,” মৃণাল বললেন। “কিন্তু এইবার প্রস্তুত হয়ে। কারণ সেখানে যা আছে, তা তোমাদের সহজে ছাড়বে না।”


দশম অধ্যায়: দ্বিতীয় যাত্রা

রাতুল, রাজীব, এবং মৃণাল সেই বাড়ির দিকে আবার রওনা হলো। মৃণাল সঙ্গে আনলেন বিভিন্ন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি—ইএমএফ ডিটেক্টর, পুরোনো কাগজপত্র এবং কিছু রিচুয়াল আইটেম।

বাড়ির সামনে পৌঁছে রাতুলের বুক কেঁপে উঠল। বাড়িটি আগের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। এইবার তাদের সঙ্গে একটি মোমবাতি জ্বলছিল, যা মৃণাল তাদের বলেছিলেন, অন্ধকার শক্তি সনাক্ত করতে সাহায্য করবে।

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের মনে হলো, যেন জায়গাটি তাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে। বাতাস ভারী হয়ে গেল, মেঝের কাঠগুলো কেমন যেন ফোঁস ফোঁস করে শব্দ করতে লাগল।

“সাবধানে থাকো,” মৃণাল ফিসফিসিয়ে বললেন। “আমাদের যা করতে হবে, তা দ্রুত করতে হবে। কারণ এটি আমাদের উপস্থিতি সহ্য করতে পারবে না।”


একাদশ অধ্যায়: সত্য উন্মোচন

তারা সেই লুকানো দরজার সামনে দাঁড়াল। মৃণাল একটি বিশেষ মন্ত্র উচ্চারণ করে দরজাটি খুললেন। ভিতরে সেই অন্ধকার ঘরটি এখন আরও অদ্ভুত দেখাচ্ছিল।

মৃণাল একটি বই বের করলেন এবং বললেন, “তোমার বাবার দল এখানে যা করেছিল, তা হলো একটি পুরোনো শক্তি জাগিয়ে তোলা। এই শক্তি এখন তোমাদের পিছু নিয়েছে। তোমাদের বাবার অপরাধের ফল তোমাদের বইতে হচ্ছে।”

রাতুল ডায়েরির অন্য পৃষ্ঠাগুলো দেখল। তাতে লেখা ছিল:
"আমরা কিছু ভুল করেছি। শক্তিটি এখন আমাদের ছেড়ে দিচ্ছে না।"

“কিন্তু এই শক্তি কেন আমাদের পেছনে?” রাতুল জিজ্ঞাসা করল।

“কারণ এই শক্তি অশান্ত। এটি মুক্তি পেতে চায়, কিন্তু তুমি এবং তোমার পরিবারের মাধ্যমে তার ক্রোধ প্রকাশ করছে,” মৃণাল উত্তর দিলেন।


দ্বাদশ অধ্যায়: শেষ লড়াই

মৃণাল একটি বিশেষ রিচুয়াল শুরু করলেন। মোমবাতির শিখা আরও তীব্র হয়ে উঠল, এবং বাড়ির চারপাশ থেকে কেমন যেন অদ্ভুত আওয়াজ আসতে লাগল।

এক সময়, ঘরের এক কোণ থেকে কালো ছায়ার মতো কিছু উঠে এল। এটি ধীরে ধীরে একটি আকার ধারণ করল—একটি বিকৃত মুখ, যা ক্রোধ এবং যন্ত্রণায় ভরা।

“তোমরা আমাকে এখান থেকে মুক্তি দাও!” সেই ছায়াটি চিৎকার করে উঠল।

মৃণাল শক্ত হাতে বললেন, “তুমি যা চাও, আমরা তা করব। কিন্তু এই দুই যুবককে তুমি ছেড়ে দাও।”

রিচুয়ালের মাধ্যমে মৃণাল ছায়াটির সঙ্গে কথা বললেন এবং তাকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেন। রিচুয়াল শেষ হলে ছায়াটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। বাড়ির বাতাস হালকা হয়ে গেল।


উপসংহার: শান্তির প্রতিশ্রুতি

সবকিছু শেষ হওয়ার পর, মৃণাল বললেন, “তোমরা এখন নিরাপদ। কিন্তু মনে রেখো, এই বাড়ি এবং এর ইতিহাস তোমাদের জীবনের একটি অংশ হয়ে থাকবে।”

রাতুল এবং রাজীব অবাক হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। তারা অনুভব করল, যেন একটি বড় বোঝা তাদের মাথা থেকে নেমে গেছে।

কিন্তু রাতুলের মনের এক কোণে একটি প্রশ্ন রয়ে গেল:
"আসলেই কি সবকিছু শেষ হয়েছে?"

কিন্তু বাড়িটি তার নতুন অতিথির জন্য অপেক্ষা করছে

Comments